৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ: স্বস্তিতে ১৪ লাখ কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ৩০-১০-২০২৬
সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ: স্বস্তিতে ১৪ লাখ কৃষক ছবিঃ সংগৃহীত

ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা স্বস্তিতে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সারা দেশে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণ ফিরছে।

ঋণের দীর্ঘ চাপ আর খেলাপি হওয়ায় নতুন করে ব্যাংকঋণ না পাওয়ার সংকটে ছিলেন এই কৃষকেরা। তাঁদের হয়ে সুদসহ মোট ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সরকার।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাড়তে থাকা উৎপাদন খরচ আর বাজারের মন্দায় বিপর্যস্ত প্রান্তিক চাষিরা ঋণ শোধের দুশ্চিন্তা ঝেড়ে আবার নতুন উৎসাহে চাষে মন দিচ্ছেন। এই পদক্ষেপের ফলে চড়া সুদের মহাজনি দাদনের শিকল ছিঁড়ে কৃষকেরা ফের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের পথে আসছেন, যার ভালো প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গ্রামের অর্থনীতিতে।

১০ হাজার টাকা পর্যন্ত যাঁরা ঋণ নিয়েছিলেন, মূল ঋণের ওপর সুদ বা বকেয়া যত টাকাই জমুক না কেন, আসল ও সুদের পুরোটাই মাফ করেছে সরকার। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কৃষকবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে নেওয়া এ কর্মসূচিকে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ মনে করছেন।

এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে তিনি বলেন, ‘সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বড় উপহার। এ উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

তাঁর যুক্তি, কৃষক টিকে থাকলে উৎপাদন বাড়বে, উৎপাদন বাড়লে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা মজবুত হবে। তাই কৃষকদের টেকসইভাবে স্বাবলম্বী করতে উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করা এবং ভর্তুকির ক্ষেত্রে কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।

তিনি আরও সতর্ক করেন, দেশে খাদ্যসংকট দেখা দিলে বিদেশ থেকে বেশি দামে খাদ্য কিনে আনতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট হলে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ চড়া দামে খাদ্য বিক্রি করে, অতীতেও এমনটা দেখা গেছে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য তাই দেশের কৃষিকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে।

অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, কেবল ঋণ মাফ করে দিলেই কৃষকের সব সংকট মিটবে না। কারণ কোনো কোনো কৃষকের ঋণ ২০ হাজার, ৩০ হাজার, ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি। তবু মওকুফের এ উদ্যোগ কৃষকদের জন্য বড় আর্থিক স্বস্তি নিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

যশোর সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের অভিজ্ঞতায় সেই স্বস্তির বাস্তব রূপ দেখা যায়। বাসসকে তাঁরা জানান, দীর্ঘ সময় ঋণ শোধের দুশ্চিন্তায় কাটানোর পর সরকারের মওকুফের সিদ্ধান্ত তাঁদের বড় স্বস্তি দিয়েছে।

দেয়াড়া ইউনিয়নের নারাঙ্গলী গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়ে পড়েছিলেন, তারপর থেকেই ছিলেন চিন্তায়। ঋণ মেটাতে বাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের গরু বেচে দেওয়ার কথাও ভাবছিলেন তিনি। ঋণ মাফ হওয়ায় তাঁকে আর কোনো সম্পদ বেচতে হয়নি।

ফারুকের ভাষায়, ‘আমার মতো মানুষের ওপর থেকে বড় একটা বোঝা নেমে গেছে। বিপদের সম্বল বাড়ির গাছ, গরু কিছুই বিক্রি করতে হয়নি।’

একই উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাউদিয়া গ্রামের কৃষক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘১০ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে দিতে না পারায় খুব চাপের মধ্যে ছিলাম। নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে সরকার গঠন করতে পারলে তারা এই ঋণ মওকুফ করে দেবে। সরকার গঠন করার পর প্রথম কাজ হিসেবে তারা এই ঋণ মওকুফ করে দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বিক্রি করার মতো কিছুই নেই। কোনোভাবেই এই ঋণ শোধ করতে পারতাম না। সরকার আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের রূপদিয়া গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী এবং আরবপুর ইউনিয়নের মালঞ্চী গ্রামের কৃষক হায়দার আলীও ঋণ মওকুফে স্বস্তি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

দেশজুড়ে এ সুবিধার সিংহভাগ কৃষকের হাতে গেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক হয়ে; এই ব্যাংক একাই মোট ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন প্রান্তিক কৃষকের ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করেছে।

বাকি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৮০৩ জন কৃষক সুবিধা পেয়েছেন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। এঁদের ক্ষেত্রে বাকি প্রায় ৭৪৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকার মওকুফ নিশ্চিত করেছে সরকার।

১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আসল ও সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে মূলত সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে, একটি নির্দিষ্ট দাপ্তরিক নীতিমালা ধরে। সাধারণ কৃষকেরা যাতে বাড়তি ভোগান্তিতে না পড়েন, সে জন্য প্রক্রিয়াটি ব্যাংকগুলো নিজেরাই সরাসরি পরিচালনা করছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অথচ কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল তাদের মোট ঋণ ও অগ্রিমের মাত্র ২ দশমিক ২৩ শতাংশ, আর নিট ঋণ ও অগ্রিমের মাত্র ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ প্রেক্ষাপটেই কৃষির উৎপাদন বাড়িয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি ও পল্লী ঋণে চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা; লক্ষ্যমাত্রাকে তোলা হয়েছে ব্যাংকগুলোর নিট ঋণ ও অগ্রিমের ৪ শতাংশে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে যা লক্ষ্য ছিল, তার চেয়ে এটি প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।

২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী খাতে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর আগের ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বিতরণ হয়েছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে বিতরণ বেড়েছে ৫ হাজার ৫০৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

খেলাপি থাকায় নতুন ব্যাংকঋণ পাচ্ছিলেন না অনেক কৃষক। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঋণ মওকুফের ফলে প্রান্তিক কৃষকেরা চড়া সুদের দাদন ব্যবসা বা মহাজনি ঋণ থেকে বেরিয়ে আবার আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং খাতে আসবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফের অর্থ সরকার সরাসরি ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করায় গ্রামীণ অর্থায়নে যুক্ত স্থানীয় শাখা ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকট কেটে যাবে। এতে গ্রামে নতুন ঋণপ্রবাহ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও গতি আসবে।



কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ